ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষিত রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ৯০ দিনের জন্য স্থগিত থাকলেও এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে। বিশেষ করে মার্কিন শুল্কনীতি এর প্রধান লক্ষ্য বেইজিংকে বিকল্প রফতানি বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগী করে তুলেছে। এছাড়া বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে কৌশলে মার্কিন বাজারে চীনা পণ্যের প্রবেশও বেড়েছে। তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি আরোপিত শুল্ক বাধা এড়াতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাধ্যমে পণ্য পাঠানো বাড়িয়েছে বেইজিং।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মার্কিন ও চীনা সরকারি তথ্যের মাধ্যমে বিষয়গুলো তুলে ধরেছে এফটি। মার্কিন পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদন অনুসারে, গত মে মাসে দেশটিতে চীনা রফতানি ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৪৩ শতাংশ কমেছে, যার আকার প্রায় ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। অন্যদিকে চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে দেশটির সামগ্রিক রফতানি বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। যেখানে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য জোট আসিয়ান অঞ্চলে ১৫ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ১২ শতাংশ বেশি পণ্য রফতানির মাধ্যমে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে চীন।
চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটন-ভিয়েতনাম বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। যার আওতায় ভিয়েতনাম হয়ে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পাঠানো পণ্যে ৪০ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। অনেকে মনে করছেন, মূলত চীনা পুনঃরফতানি বন্ধ করতেই পদক্ষেপটি নেয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, পরবর্তী অন্য যেকোনো দেশের সঙ্গে চুক্তিতে পুনঃরফতানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক অন্তর্ভুক্ত করতে পারে ওয়াশিংটন।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের এশিয়া বিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ মার্ক উইলিয়ামস বলেন, ‘প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, আমরা স্পষ্টভাবে একটা প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি, যা আমরা আগেও দেখেছি প্রথম যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে। তখন চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হঠাৎ কমে গেলেও ভিয়েতনাম ও মেক্সিকো থেকে আমদানি বেড়েছিল।’
২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের ওপর বাড়তি শুল্ক ধার্য করেন। এরপর ভিয়েতনামের উৎপাদন খাতে বিপুল গতি দেখা যায়। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের পৃথক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত মে মাসে ভিয়েতনাম হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া চীনা রফতানি পণ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার মাধ্যমে রফতানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮০ কোটি ডলার, যা গত বছরের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি।
চীনা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ভিয়েতনামে ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, যেমন প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড, ফোনের যন্ত্রাংশ ও ডিসপ্লে মডিউলের রফতানি এক বছরের ব্যবধানে ৫৪ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬০ কোটি ডলারে।
এদিকে ট্রাম্পের শুল্কের প্রভাব ভারতে সবচেয়ে বেশি পড়েছে স্মার্টফোন শিল্পে। এর মূল কারণ আগামী বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রির জন্য সব আইফোন ভারতে তৈরি করবে অ্যাপল। গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব জানান, মে মাসে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি ১৭ শতাংশ বেড়েছে, আর চীন ও হংকং থেকে আমদানি বেড়েছে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। তিনি বলেন, ‘চীন থেকেই ভারতে ইলেকট্রনিকস ও যন্ত্রপাতির বেশির ভাগই আমদানি হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রফতানির ঊর্ধ্বগতি দেখায় যে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন শুল্কের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানো কঠিন এমন পণ্যের ক্ষেত্রে বিকল্প বাজার খুঁজছে চীন। এরই মধ্যে সরবরাহ চেইন সম্প্রসারণও করেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ অর্থনীতি। সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) চীনা রফতানি মে মাসে ১১০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও ডিসপোজেবল ই-সিগারেট ছিল এ প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান উপাদান। আবুধাবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ মনিকা মালিক বলেন, ‘চীন পণ্য রফতানির জন্য এখন বিকল্প বাজার খুঁজছে। সেখানে এ অঞ্চলের চাহিদা বেশি। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে জনসংখ্যা বেড়েই চলেছে, বিনিয়োগ শক্তিশালী ও নিজস্ব উৎপাদন খুব কম।’
ইউরোপের বাজারও চীনা পণ্যে সয়লাব হচ্ছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে অভিযোগ করেছেন। যেখানে চীনের অতিরিক্ত রফতানি সরাসরি ভোক্তাদের কাছে যাচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশন গত সপ্তাহে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) বস্ত্র, রাসায়নিক ও যন্ত্রপাতির আমদানি গত বছরের তুলনায় তীব্রভাবে বেড়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, এখনই স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত টানা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন হলো ইউরোপে কত দামের চীনা পণ্যের প্রবেশ বৃদ্ধি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘ডি মিনিমিস’ নিয়ম বাতিল করার পর থেকে এটি ঘটছে। এর আওতায় ৮০০ ডলারের নিচে এমন দামের পণ্য প্রবেশে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক ছাড় দেয়া হতো, যা দিয়ে টেমু ও শিনের মতো চীনা অনলাইন খুচরা বিক্রেতারা যুক্তরাষ্ট্রে সহজে পণ্য পাঠাত। নতুন নিয়মে যুক্তরাষ্ট্রে এ সুবিধা না থাকায় চীন ও হংকং থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আকাশপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ হঠাৎ কমেছে। ওয়ার্ল্ডএসিডি জানায়, জুনের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে আকাশপথে চীন থেকে পণ্য পরিবহন আগের বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশ কমেছে।
সব মিলিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কবিরতির পর যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক সম্পর্কগুলো পাল্টে যেতে পারে। তথ্য বলছে, গত কয়েক মাসের অনিশ্চয়তাই বিশ্বজুড়ে কোম্পানিগুলোকে সরবরাহ চেইন পুনর্বিন্যাসে বাধ্য করেছে। তবে সরবরাহ চেইন-বিষয়ক পরামর্শক সংস্থা সাপ্লাই চেইন লজিস্টিকসের প্রধান নির্বাহী লেস ব্র্যান্ড বলেন, ‘নতুন সরবরাহকারী খুঁজে বের করা কঠিন ও ব্যয়বহুল। মান নিয়ন্ত্রণ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি অনেক সময় ও খরচের ব্যাপার।’